বিলুপ্তির পথের ধানের গোলা-স্মৃতি হিসেবে পড়ে আছে বসতভিটায়।

সরদার কালাম (কলারোয়া)সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় এখনো কিছু গোলা চোখে পড়ে-যেগুলো পূর্বপুরুষের স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছেন কৃষকেরা বসতভিটা বা বাড়ির উঠানে।

গ্রামে-গঞ্জে এক সময় অবস্থা সম্পন্ন কৃষকের বাড়িতে শোভা পেতো ধানের জন্য বিশেষ উপকরণ-বাশঁ,বেত,তাঁর বা চিকন প্লাস্টিক সূতো দিয়ে বাঁধানো /ব্যবহার উপযোগী তৈরিকৃত গোলা(গোলাকৃত হওয়ায় গোলা নাম উঠে এসেছে বলে অনেকের অভিমত)।

যাদের জমির পরিমাণ একটু বেশি তারা ধান সংরক্ষণের জন্য ওই গোলা ব্যবহার করতেন।আর সল্প জমির কৃষক সচরাচর চাচ মোড়ানো(আঞ্চলিক ভাষা আউড়ি)কিংবা বস্তা ব্যবহার করে ধান রেখে আসছেন অনেকেই।তবে গ্রমাবাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক ধানের গোলা খুবই উপযোগী।ধানের মৌসুমে ধান কেটে ঝেড়ে শুকিয়ে গোলায় রাখা হয়।

প্রয়োজনের সময় গোলা থেকে ধান বের করে পুনরায় রোদে শুকিয়ে ধান ভাঙানো এবং বিক্রি করা হয়ে থাকে।বর্তমানে অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে ওই ধান রাখার বিশেষ পন্থা বা নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গোলা।তবুও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে বাড়ির উঠানে এখনো কেউ কেউ ওই ধানের গোলা রেখে দিয়েছেন।

আকার অনুযায়ী ওসব ধানের গোলায় ১০০ থেকে ১৫০ মণ ধান সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে।উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এখনও চোখে পড়ে ওইসব ধানের গোলা।কিছু মোটামুটি ব্যবহারে,আবার কিছু পরিত্যক্ত অবস্থায় স্মৃতি হিসেবে পড়ে আছে কৃষকদের উঠানে।উপজেলা দেয়াড়ার মোঃ সাইদুর রহমান,মোঃ মহিদুল ইসলামসহ কয়েকজন বলেন,এক সময়ে নামকরা গেরস্থ বলতে-মাঠ ভরা সোনালি ফসলের ক্ষেত,গোয়াল ভরা গরু,পুকুর ভরা মাছ আর কৃষকের গোলা ভরা ধানকেই বুঝানো হত।কিন্তু এসব এখন যেন প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে।হারিয়ে গেছে গেরস্থের ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা। আগামী নতুন প্রজন্মের কাছে হবে ইতিহাস।উপজেলা দেয়াড়া এলাকার কিছু নাম উল্লেখ করে-উলুডাঙ্গার মোঃ কপীল উদ্দীন গাজী,মফে গাজী,নিছার গাজী,ফজর আলী গাজী,ইয়াসিন গাজী,রিজাউল গাজী এবং দলুইপুরের নজরুল ইসলাম সরদার,নিছার আলী সরদার,মোস্তফা সরদার,গনি আমিন সরদার,আক্তারুল ইসলাম গাজী,তাইজুল ইসলাম,ইদ্রিস আলীসহ ইউনিয়ন ও পার্শ্ববর্তী গ্রাম এলাকার কতিপয় ব্যক্তিরা কমবেশি ব্যবহার করে যাচ্ছেন।এবং কেউবা ব্যবহার না করলেও এখনও পুর্বপুরষদের ব্যবহৃত সেই ধানের গোলা স্মৃতি স্বরুপ সংরক্ষণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে জানান তারা।এছাড়াও নতুন সংস্কারে ব্যবহার করে যাচ্ছি ধানের গোলা বলে জানান নিছার আলী সরদারসহ কয়েকজন প্রান্তিক কৃষক।গেরহস্থ কৃষকদের প্রত্যেকের বাড়িতে দুই একটি করে গোলা আছে।নিজেরসহ নিজের ভাই ও চাচাতো ভাইদের একটা করে ধানের গোলা রয়েছে।সেই গোলাগুলোর মধ্যে অনেকের এখনো ব্যবহৃত অবস্থায় ভালো আছে।এবং গোলাতে ধান সংরক্ষণ করছেন।অবশ্য এখন আর আগের মতো কেউ ধান রাখে না।বস্তায় করে গোডাউন অথবা ঘরের মধ্যে রেখে দেন অনেকেই।তবে তিনি ও তার পার্শ্ববর্তী ভাই প্রতিবেশীরা গোলায় ধান সংরক্ষণ করে রাখেন বলে জানান প্রান্তিক কৃষক ও পুরাতন আড়ৎ ব্যবসায়ী নিছার আলী সরদার।এদিকে উপজেলার যুগিখালী ইউনিয়নবর্তী কামারালীর আনোয়ারুল ইসলাম,আব্দুল মান্নানসহ কয়েকজন জানান,প্রথমে বাঁশ-কঞ্চি দিয়ে গোল আকৃতির কাঠামো তৈরি করা হতো।এঁটেল মাটির কাদা তৈরি করে ভেতরে ও বাইরে আস্তরণ লাগিয়ে উপরে টিনের চালা দিয়ে বিশেষ উপায়ে তৈরি করা হতো ওই ধানের গোলা।ধানের গোলা বসানো হতো ২/২.৫ ফুট মত উঁচুতে।প্রবেশপথ রাখা হতো বেশ ওপরে,এমনকি একেবারেই গোলার উপরিভাগের দিকে ছোট্ট ফোকড় রেখে,যেন চোর বা ডাকাতে ধান নিতে নাপারে।বিশেষ ব্যবস্থার জন্য ধানের গোলায় ঢুকে ক্ষতি করতে পারতো না ইঁদুর পর্যন্ত।গোলায় শুকানো ভেজা ধানের চাল হতো শক্ত ও গন্ধহীন।একসময় কৃষকের কাছে এটিই ছিলো ধান রাখার আদর্শ পন্থা।এছাড়াও উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন এলাকার কৃষকরা পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে বাড়ির উঠানে ধানের গোলা রেখে সেগুলোতে ধান রাখছেন।ওই গোলাগুলো সেসব পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে।অনেকেই দাদার আমল থেকে দেখে আসছেন এগুলো।ধান রাখার পাশাপাশি ঐতিহ্য রক্ষায় এখনো রেখে দিয়েছেন বলে জানান আনোয়ারুল ইসলামসহ কয়েকজন।এখন আর গোলার প্রচলন বা সেরকম কদর নেই।অনেকেই ড্রাম-বস্তা কিংবা গোদামজাত করে ধান রাখে।তবে তাদেরসহ পাশাপাশি প্রতিবেশী কয়েকজন পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য হিসেবে একেক জনের একটি করে গোলা আছে,যেটা স্মৃতি হিসেবে মেরামত করে ধান রাখার জন্য ব্যবহার করছেন বলে জানান আনোয়ার।এদিকে উপজেলার পাটুলিয়া,কলাটুপি,উলুডাঙ্গা,মিরডাঙ্গা,পাকুড়িয়া,খোরদো, দেয়াড়াসহ পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন অঞ্চলের কতিপয় কৃষকরা জানান,একেক ধানের মৌসুমে যে ধান পাই তা’ত বিক্রি করে আর খেতেই ফুরিয়ে যায়।গোলায় রাখবো কী?তাছাড়া ফসলে তেমন কোন লাভ হচ্ছে না,খাটুনী-খরচের তুলনায় ফসলে দাম কমের কারণে।অন্য ফসল উৎপাদন – তরকারি,কুলফলসহ বিভিন্ন চাষাবাদে ঝুঁকে ধান চাষ ও ফসলী জমি অনেক কমিয়ে দিয়েছে।তবুও অযত্নে অবহেলায় রেখে দিয়েছে পুরনো ঐতিহ্য বহনকারী ধানের গোলা।একদিন এভাবেই শেষ হয়ে যাবে ওই পুরানো ঐতিহ্য ধানের গোলা বলেও আক্ষেপের সহিত ব্যক্ত করেন বিভিন্ন শ্রেণীর কৃষকরা।তাছাড়া একসময় কলারোয়া উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা জুড়ে গেরহস্থ কৃষকের ঘরে ঘরে গোলায় ধান রাখা হতো।তবে বর্তমানে আংশিক দেখা মিললেও এখন আর তেমন ব্যবহার উপযোগী ভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না সেই ধানের গোলা।কিছু গোলা কৃষকদের ঐতিহ্য বহনে ও স্মৃতি হিসেবে বসতভিটার উঠানে রাখা হয়েছে,তবে আগের তুলনায় বিলুপ্তির পথে ধানের গোলার সেই ঐতিহ্য ও ব্যবহার।

কালাম সর্দার

কলারোয়া (সাতক্ষিরা ) প্রতিনিধি, দীর্ঘদিন থেকে সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িয়ে আছেন। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশই তাঁর লক্ষ্য এবং এ বিষয়ে তিনি অনেক সচেতন।