লাশের সিরিয়াল ধর্ষক ডোম মুন্না

হাসান মাহমুদ : হাসপাতাল মর্গে কোন নারীর মরদেহ আনা হলে রাতে মুন্না (২০) তাকে ধর্ষণ করতো। এভাবে গত প্রায়  দেড় বছর ধরে চলছিলো তার অপরাধ রাজত্ব। ধর্ষণ, হত্যাসহ যেসব ঘটনায় মরদেহ ময়নাতদন্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়, সেসব আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা এবং প্রোফাইল তৈরি করে আসছিলো সিআইডি। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে অত্যন্ত উন্নত মানের ল্যাব রয়েছে ‘সিআইডি’র। সিআইডি’র হাতে ৩০ হাজারের বেশি অপরাধীর প্রোফাইল আছে। বিভিন্ন মরদেহে একই পুরুষের ‘শুক্রানু’র উপস্থিতি সম্পর্কে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সংশ্লিষ্টরা বিস্মিত হয়ে যান। তারা দেখতে পান, বিভিন্ন এলাকা থেকে মর্গে আসা নারীর মরদেহে একই ব্যক্তির ধর্ষণ আলামত ও শুক্রানুর উপস্থিতি। বিভিন্ন এলাকা থেকে মরদেহ আসে ময়না তদন্তের জন্য কিন্তু শুক্রানু একই ব্যক্তির কিভাবে ! ডিএনএ প্রোফাইল করার সময় এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তদন্তের ভার দেয়া হয় সিআইডির ঢাকা পশ্চিমের ওপর। টানা তিন সপ্তাহ তদন্তের জন্য সিআইডি ৫টি লাশের হিস্ট্রি ও নথিপত্র হাতে নেয়। এই ৫টি লাশ ভিন্ন ভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন পাঁচ এলাকা থেকে মর্গে আনা হয়েছিলো। কিন্তু তাদের সবার দেহে একই ব্যক্তির শুক্রানু পাওয়া গেছে। ওই পাঁচটি লাশ মর্গে রাখার সময় রাতে কে দায়িত্বে ছিলো তার অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, ডোম জতন কুমার লালের সহযোগি তরুণ ‘মুন্না ভগত’ রাতে হাসপাতাল মর্গের পাশেই থাকতো। সিআইডির সদস্যদের সন্দেহের তীর তখন মুন্নার দিকে। মুন্নার ব্যাপারে গোপনে বিভিন্ন তথ্য নেয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মুহূর্তে সে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সৈয়দ রেজাউল হায়দার গতকাল এক প্রশ্নের উত্তরে জানান, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। একের পর এক কাজটি করার কারণেই বিষয়টি নজরে আসে। তথ্য প্রমাণ হাতে পাবার পরই তাকে আমরা গ্রেফতার করি।’ বিশিষ্ট অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ক্রিমোনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক গতকাল শুক্রবার প্রতিবেদককে জানান, মুন্না বয়সে তরুণ। যারা মর্গে লাশ কাটার কাজ করে তারা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে যায়। আমরা অপরাধের ভাষায় বলি, তারা ডিজঅর্ডার অবস্থায় থাকে। তাদের অনেকের আবার নেক্রোফিলিয়া হয়। অর্থাৎ নারী মরদেহের সাথে যৌন আসক্ত থাকে। এটা অনেক বড় অপরাধ।’ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মুন্না ভগত গত  দেড় বছর ধরে মর্গে থাকা মৃত নারীদের ধর্ষণ করে আসছিল। মুন্নার বাবার নাম দুলাল ভগত। গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ বাজারে। সে আরও দুই-তিন জনের সঙ্গে মর্গের পাশে একটি কক্ষেই রাতে থাকত। রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে মৃত নারীদের ধর্ষণ করতো সে। ২০১৯-এর মার্চ থেকে ২০২০-এর অগাস্ট পর্যন্ত একটি মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে পাওয়া মৃত নারীদের দেহে পুরুষ শুক্রানুর উপস্থিতি পায় সিআইডি। কিন্তু একাধিক নারীর মরদেহে একজন পুরুষের শুক্রানুর উপস্থিতি তাদের চমকে দেয়। তারা সেই পুরুষকে চিহ্নিত করার জন্য মাঠে নামে। মরদেহে পাওয়া শুক্রানুর ওপর ভিত্তি করে সেই পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়। তাতে অপরাধীর তালিকা ধরা হয়। প্রাথমিকভাবে সিআইডি`র ধারণা ছিল, প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি ভুক্তভোগীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে অথবা হত্যার পর ধর্ষণ করেছে। তবে পরে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের পর সিআইডি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে কোনো একজন ব্যক্তি মরদেহের ওপর `বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ` করছে। বৃহস্পতিবার রাতে সিআইডি তাকে গ্রেফতার করে। সিআইডি জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করেছে। শেরেবাংলা নগর থানা এলাকার ওই মেডিকেল কলেজের ডোমদের তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায়, সিআইডি’র অনুসন্ধান শুরুর পরে  ডোম মুন্না ভগত গা ঢাকা দেয়। তাতে তাদের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার দণ্ডবিধির ৩৭৭, ১৭০ ও ১০৯ ধারায় দায়ের করা মামলায় (মামলা নং: ৪০) গতকাল মুন্নাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মরদেহে পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে আসামির ডিএনএ প্রোফাইলের মিল পাওয়া গেছে বলে জানায় সিআইডি। এবারই  দেশে এ ধরনের অপরাধির প্রথম সন্ধান পাওয়া গেলো। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে মৃত নারীদের ধর্ষণ করার অভিযোগে গ্রেফতার মুন্না ভগত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশিদ তার জবানবন্দি গ্রহণ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।